শ্যামশ্রী রায় কর্মকার / বলতে পারিনি / Shyamashri Ray Karmakar
বলতে পারিনি
শ্যামশ্রী রায় কর্মকার
সমস্ত শব্দের টুঁটি সর্ব শক্তি দিয়ে টিপে ধরে
নিরাপদ হয়ে আছি
তাই ঠিক বলতে পারিনি
পাশের ফ্ল্যাটের কাকু কাকিমাকে বেদম পেটালে
কাকিমার পিঠ জুড়ে কালশিটে দাগ হয়ে যেতো
সোনালী শরৎ রোদে মেঘ থমথম করলে যেমন হয়
ধানরঙা কব্জিতে জ্বলন্ত সিগারেট ঘষে
বাঁজা লিখে দিয়েছিল কাকু
কাকিমার নীরবতা চিৎকার হয়ে ধাক্কা খেত ঘরের দেওয়ালে
দোতলার তিনুমামা ছাদ থেকে পড়ে গিয়েছিল
সেই থেকে মাথার অসুখ
রোদ্দুরকে ঘোড়া মনে করে সওয়ার হতে চাইত সারাদিন
বৃষ্টি হয়ে যেতে চাইত দুঃখ হলে
পাড়া পড়শির বাড়ি, কিছুকিছু আত্মীয় স্বজন
তাকে নিয়ে সেকি হাসাহাসি!
আমি তখন বেশ ছোট
অসুখ করলে তাকে নিয়ে এসব করতে নেই
কাউকেই বলতে পারিনি
কলেজ যাবার পথে কজন বেপাড়ার ছেলে
মিতাদির পথ আটকাত
মিতাদি যেন এক বলহীন শাসকের সাম্রাজ্য
মাটি, ঘাস, দুর্গের সজ্জিত তোরণ
ওরা সাইকেল ছুটিয়ে এসে
আলতো করে ধাক্কা দিত পিছন থেকে
হিংস্র একটা টান দিত ওড়না ধরে
হেসে উঠতো দিগ্বিজয়ের আনন্দে
মিতাদি রোজ মরে যেত লজ্জায় আর অপমানে
খুব রাগ হত জানেন
চেঁচিয়ে বলতে ইচ্ছে করত
থামো বলছি,এক্ষুনি থামো
ভয়ে বলতে পারিনি
যদি আমারও অমন হয়
তারপর একদিন ওরা এসিড মেরে মিতাদির মুখ পুড়িয়ে দিল
কেন জানেন?
মিতাদি না বলেছিল বলে
আমি কিন্তু ওদের সবাইকে চিনতাম
তবু
একটি ছায়াহৃত বৃক্ষের মতো স্থাণু হয়েছিলাম
পুলিশকে বলতে পারিনি একটি কথাও
মিতাদিকে বলতে পারিনি,
'আমি তোমার পাশে আছি'
আমি তো ওর পাশে থাকতে পারিনি বলুন!
কীভাবে বলতাম!
আমার অফিসের বেয়ারা রমেশ
ওমলেট না খেলে কারো কাজ করেনা কোনদিন
ওমলেট মানে জানেন তো?
ঘুষ
কারোর সিঙ্গেল ডিম
কারোর ডাবল
এসবই ফাইলের দর
জানা আছে
অসহযোগিতার ভয়ে রমেশকে বলতে পারিনি
বলতে পারিনি যে
আমার মা আমার শাশুড়ির চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়
ভোট দেবার সময় পরিবারের মত আমার মত নয়
অন্যের পছন্দ আমার পছন্দ নয়
বলতে পারিনি
আমার ভাল লাগে বলে আমি সাজি
ভাল লাগে বলে গান গাই
অন্য কারও জন্য নয়
আমার ইচ্ছা করলে তোমাকে সেভাবে আদর করব
একলা তোমার ইচ্ছা করলে নয়
বলা যায় না জানেন
সুখে থাকতে গেলে,বেঁচে থাকতে গেলে,নিরাপদে থাকতে গেলে
কাউকে কিছু বলা যায় না
আমাদের দমচাপা সমস্ত চিৎকার
আমাদের শোক, তাপ, ধ্বংসের জীবন
গলার রগ ফুলে ওঠা একেকটা কবিতা হয়ে যায়

Comments
Post a Comment